দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও কোম্পানির অন্তত ৭০০ কোটি টাকা মেরে দিয়ে কাতার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন এক ব্যবসায়ী। ইকবাল তামজু মিয়া ওরফে নাজিম মোল্লা নামের ওই ব্যবসায়ী চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানাধীন ষোলশহর এলাকার বাসিন্দা। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশের উদ্দেশে কাতার ত্যাগ করেন। এরপর থেকে ওই দেশের ব্যবসায়ী ও পাওনাদাররা ইকবালের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছেন না।
তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সেখানকার সবকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও ঝুলছে তালা। চট্টগ্রাম নগরীর কসমোপলিটন আবাসিক এলাকায় তার বাসভবনে গিয়েও কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। যোগাযোগ করতে না পেরে পাওনাদাররা ধরনা দিচ্ছেন কাতারে বাংলাদেশ দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তারা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। কাতারেও ফৌজদারি মামলা করেছেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী।
এদিকে ইকবালের এমন প্রতারণায় কাতারে বাংলাদেশি প্রবাসীরা বিপাকে পড়েছেন। সেখানে দেশের ভাবমূর্তি যেমন নষ্ট হয়েছে, তেমনই ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের ভিসা নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা যায়, ইকবাল কাতারে ৩০-৩৫ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। সানোয়ারা ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে তিনি বাংলাদেশ থেকে নানা ধরনের সবজি পণ্য নিয়ে সুপারশপে সরবরাহ করতেন। বাংলাদেশি, পাকিস্তানিসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীর লেনদেনে তার কাছে অন্তত ৭০০ কোটি টাকা আটকে যায়। এ অবস্থায় ২৮ ডিসেম্বর তিনি গোপনে কাতার ছেড়ে বাংলাদেশে আসেন এবং পাওনাদারদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, যুগান্তরের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, স্যুভেনিয়র ট্রেডিং লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ইকবালের কাছে পাওনা রয়েছে ৪২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৬৬ রিয়াল (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪ কোটি ৫৩ লাখ ৭৯ হাজার ৪৪ টাকা)। আবু জাহের ভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্রুটস ট্রেডিং নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠানের পাওনা ১ কোটি ৫১ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। বেস্ট কোয়ালিটি ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল ট্রেডিং পাবে ২ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ৬০৪ টাকা। ১০ মার্চ স্যুভেনিয়র ট্রেডিং-এর পক্ষে সাঈদ ইসলাম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে ২ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার ৮০০ রিয়াল পাওনার কথা উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে কাতারের আদালতে ইকবালের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইকবালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ সদরদপ্তরকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেয়। কিন্তু পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কোনো নির্দেশনা এখনো চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) আসেনি। ইকবাল কোথায় আছেন, সেই খোঁজও নেই পুলিশের কাছে।
চট্টগ্রামের স্নেহা এন্টারপ্রাইজ ও আলফালাহ ট্রেডিং নামে দুটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানি কোম্পানি স্যুভেনিয়র ট্রেডিং-এর মাধ্যমে ইকবালের প্রতিষ্ঠানে ২ কোটি ৩২ লাখ ৮ হাজার ৪৬৮ টাকার পণ্য (সবজি) পাঠায়। এ টাকাও আটকে গেছে।
স্নেহা এন্টারপ্রাইজের মালিক শাহ আলম বলেন, আমি আড়াই কোটি টাকার পণ্য পাঠিয়েছি ইকবালের প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু এক কানাকড়িও না দিয়ে ওই ব্যবসায়ী কাতার থেকে পালিয়ে এসেছেন। ইকবালের এক ভাই বলেছেন, তিনি বাসায় থাকেন না। কোথায় আছেন, তাও বলতে পারবেন না।