কুমিল্লায় এইচআইভি/এইডস পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত জেলায় এইডসে আক্রান্ত হয়ে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৩৭ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই পুরুষ সমকামী ও পুরুষ যৌনকর্মী। এইডস সংক্রমণ নিয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে বর্তমানে ১৫টি জেলার মোট ৫৪৬ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের মধ্যে শুধু কুমিল্লা জেলার বাসিন্দাই আছেন ৩৮৫ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কুমিল্লায় ইতোপূর্বে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত এনজিওগুলোর এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ থাকায় এই সংক্রমণ ও ঝুঁকির হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ফলে এইডসের এই নীরব বিস্তার আগামী দিনে মহামারির রূপ নিতে পারে।
অন্যদিকে কুমিল্লার আলেম সমাজ ও ইসলামি চিন্তাবিদগণ মনে করেন, ধর্মীয় অনুশাসন এবং নৈতিক মূল্যবোধের অভাবই এইডসের বিস্তার ঘটছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের এইচআইভি এইডস এইচটিসি/এআরটি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত মে মাসেই ৩ জন এইডস রোগী মারা গেছেন। মৃতদের বয়স ২০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে ৬৭২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩৭ জন নতুন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।
এইচআইভি এইডস এইচটিসি/এআরটি সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, কুড়িগ্রাম, ঝিনাইদহ, হবিগঞ্জ ও বান্দরবান জেলার ৫৪৬ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
চিকিৎসা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, আগে রক্ত সঞ্চালন বা প্রবাসীদের মাধ্যমে ছড়ানোর প্রবণতা বেশি থাকলেও, বর্তমানে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক। চলতি বছরে ৩৭ জন আক্রান্তদের মধ্যেও ১৮ জন পুরুষ সমকামী এবং ৫ জন পুরুষ যৌনকর্মী রয়েছেন, যা মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি।
কুমেকের এইচআইভি এইডস এইচটিসি/এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিন মো. আরিফ হাসান জানান, ‘আগে বেশির ভাগ সংক্রমণ রক্ত আদান-প্রদানের মাধ্যমে ছড়াত। তবে এখন যেসব নতুন কেস পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশির ভাগই যৌনবাহিত। এটি সবচেয়ে শঙ্কার বিষয়।’
এদিকে, সরকারিভাবে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও এআরটি (অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি) ওষুধ দেওয়া হলেও এই সেন্টারের স্বাস্থ্যকর্মীরা চরম অবহেলার শিকার। গত প্রায় দুই বছর ধরে এই সেবার সঙ্গে যুক্ত কাউন্সেলর ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও মানবিক দিক বিবেচনা করে তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় হাসপাতালে শুধু তারাই আসছেন, যারা একদম শেষ পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লায় আগে একাধিক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও বিদেশি দাতাসংস্থার অর্থায়নে এইচআইভি প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক কাজ করতো। তারা মূলত উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী যেমন সমকামী (এমএসএম), হিজড়া, নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী এবং সুই-সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের সচেতন করা, বিনামূল্যে কনডম ও লুব্রিকেন্ট বিতরণ এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় নিয়ে আসতো। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে এনজিওদের এই ‘আউটরিচ’ বা প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলো পুনরায় অনিরাপদ যৌনাচারে লিপ্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে, কুমিল্লার আলেম সমাজ ও ইসলামি চিন্তাবিদগণ উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ধর্মীয় অনুশাসন অমান্য করে অবাধ যৌনাচার ও অনৈতিক জীবনযাপনের কারণেই এই মরণব্যাধি সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শিরায় মাদক গ্রহণ এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রাও এইচআইভি সংক্রমণের কারণ। ইসলামে সব ধরনের মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য হারাম বা নিষিদ্ধ করায় ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।